গুরুপ্রণাম

“জ্ঞানের নিধান আদিবিদ্বান কপিল সাঙ্খ্যকার
এই বাঙলার মাটিতে গাঁথিল সূত্রে হীরক-হার।” – সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

বাংলার আদি ধর্ম যদি কিছু বলতে হয় তা হল সাঙ্খ্য। প্রকৃতি উপাসনার একটি সঙ্গবদ্ধ রূপ দিয়েছিল এই সাঙ্খ্যদর্শন, যা ক্রমে বিস্তৃত হয়েছে শুধু বাংলায় নয় বরং সমগ্র ভারত জুড়েই। বাংলার ধর্মের বিচার করতে গেলে দেখা যায় বাংলায় যুগ যুগ ধরে চলে আসা বিভিন্ন ঐতিহ্য নিহিত রয়েছে প্রকৃতি-পুরুষ দ্বৈতবাদেই। বঙ্কিম বলছেনঃ

“সাংখ্যের প্রকৃতি পুরুষ লইয়া তন্ত্রের সৃষ্টি। সেই তান্ত্রিককাণ্ডে দেশ ব্যাপ্ত হইয়াছে। … সেই তন্ত্রের প্রসাদে আমরা দুর্গোৎসব করিয়া এই বাঙ্গালা দেশের ছয় কোটি লোক জীবন সার্থক করিতেছি। যখন গ্রামে গ্রামে, নগরে মাঠে জঙ্গলে শিবালয়, কালীর মন্দির দেখি, আমাদের সাংখ্য মনে পড়ে; যখন দুর্গা কালী জগদ্ধাত্রী পূজার বাদ্য শুনি, আমাদের সাংখ্যদর্শন মনে পড়ে।

সহস্র বৎসর কাল বৌদ্ধধর্ম্ম ভারতবর্ষের প্রধান ধর্ম্ম ছিল। ভারতবর্ষের পুরাবৃত্ত মধ্যে যে সময়টি সর্ব্বাপেক্ষা বিচিত্র এবং সৌষ্ঠব-লক্ষণযুক্ত, সেই সময়টিতেই বৌদ্ধধর্ম্ম এই ভারতভূমির প্রধান ধর্ম্ম ছিল।ভারতবর্ষ থেকে দূরীকৃত হইয়া সিংহলে, নেপালে, তিব্বতে, চীনে, ব্রহ্মে, শ্যামে এই ধর্ম্ম অদ্যাপি ব্যাপিয়া রহিয়াছে। সেই বৌদ্ধধর্ম্মের আদি এই সাংখ্যদর্শনে। বেদে অবজ্ঞা, নির্ব্বাণ, এবং নিরীশ্বরতা, বৌদ্ধধর্ম্মে এই তিনটি নূতন; এই তিনটিই ঐ ধর্ম্মের কলেবর। উপস্থিত লেখক কর্ত্তৃক ১০৬ সংখ্যক কলিকাতা রিবিউতে ‘বৌদ্ধধর্ম্ম এবং সাংখ্যদর্শন’ ইতি প্রবন্ধে প্রতিপন্ন করা হইয়াছে যে, এই তিনটিরই মূল সাংখ্যদর্শনে। নির্ব্বাণ, সাংখ্যের মুক্তির পরিমাণ মাত্র। “

যেমন বাল্মীকি হলেন আদিকবি, তেমন আদিবিদ্বান হলেন মহর্ষি কপিল। এই বাংলায় তাঁর জন্মস্থান খুলনা জেলায়। খুলনা জেলায় পাইকগাছা উপজেলায় কপিলমুনি ইউনিয়ন অদ্যবধি বিদ্যমান। এছাড়া গঙ্গাসাগরে কপিলমুনির আশ্রম একটি বিখ্যাত তীর্থক্ষেত্র। বাঙালির সাথে তাঁর নাড়ীর বন্ধন যে এখনো ছিন্ন হয়নি তার একটি প্রমাণ যেমন উত্তর কোলকাতার শরবতের দোকান কপিলাশ্রম।

সাঙ্খ্য সম্পর্কে অধ্যাপক রিচার্ড গার্বে লিখেছেন,

“In Kapila’s doctrine, for the first time in the history of the world, the complete independence and freedom of the human mind, its full confidence in its own powers were exhibited.”

এরই ফল হয়তো বাঙালি বয়ে চলেছে তার পরের আড়াই সহস্র বছর ধরে। প্রাচীন বাংলা ছিল বৌদ্ধধর্মের চারণভূমি। সেই বুদ্ধের জন্মের স্থানের নামও আশ্চর্যজনকভাবে হল কপিলবস্তু। হয়তো সেই সাঙ্খ্যকারদের ভূমি এবং তার সংস্কৃতির প্রভাবেই গড়ে উঠেছে বৌদ্ধধর্ম, যাতে কপিলের প্রভাব স্পষ্ট। বজ্রযান এবং সহজযানের মাধ্যমেই বাংলা পেয়েছে তার শাক্ত ও বৈষ্ণবধারা। মৎস্যেন্দ্রনাথ হোক, শ্রীচৈতন্য হোক বা কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ, আদিবিদ্বান রয়ে গিয়েছেন বাঙালির আদিগুরু। গুরুপূর্ণিমার পুণ্য তিথিতে সেই গুরুর প্রতিই সশ্রদ্ধ প্রণাম।

কৃতজ্ঞতাঃ
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ডঃ তমাল দাশগুপ্ত
ইমন জুবায়ের

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s