গরুচুরি থেকে সত্য চুরি

‘জুনেদ’- এই একটি নাম সম্বল করে ঘুরে দাঁড়াতে মরিয়া ভারতবর্ষ তথা পশ্চিমবঙ্গের বিবেকহীন বুদ্ধিজীবীমহল। মধুসূদন মঞ্চে তারা এক সরকারী পৃষ্ঠপোষিত তথাকথিত প্রতিবাদে নাম লিখিয়েছে । ভারতের একটি ‘lynch map’ উঠে এসেছে এই তথাকথিত আন্দোলনের হাত ধরেই, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই স্থান পায়নি শ্রীনগরের মহম্মদ আয়ুব পণ্ডিত অথবা পুনের সায়ন রাঠোর

অলীক কুনাট্য রচনার ক্ষেত্রে তো অনেক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে ইন্দ্রজিৎ দত্ত মহরমের চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় যাঁকে প্রাণ হারাতে হযেছিল। এই সব হত্যা তাই হয়ে যায় নিছক Statistics আর জুনেদ স্থান পায় ইতিহাসের খাতায়। Statistics এর কথাই যখন উঠল, তখন এটা জানিয়ে রাখা ভালো যে গত সাত বছরে গরু ঘটিত কারণে প্রাণ হারিয়েছে ২৮ জন যা সমস্ত হত্যার ০.০১ শতাংশ। অবশ্যই সরকারী পোষণ তো আর সত্যান্বেষণে পাওয়া অসম্ভব।

এছাড়া ২০১২ এবং ২০১৩’র হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলেছিল প্রাক্তন ইউপিয়ে সরকারও, তবে তার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ আনার ধৃষ্টতা তো দেখাতে পারেন না এই বুদ্ধিজীবীকুল।

আবার মজার ব্যাপার হল ‘lynch map’য়েই  স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে চোপরায় গণপ্রহারে মৃত তিন ব্যক্তি, যাদের সেখানকার তৃণমূল বিধায়ক  নিজেই গরুচোর বলে চিহ্নিত করতে বাধ্য হয়েছেন।  গ্রামবাসীদের মতে পুলিশ গরুচুরির সমস্যা তাদের নিজেদেরই সমাধান করার নির্দেশ দেয়। যারা দিনরাত অর্থনীতির কথা বলেন তাঁরা গ্রামবাসীদের গরুচুরির অর্থনৈতিক ক্ষতিকে গ্রাহ্য় করতেই রাজি নন। গ্রামবাসী কৃষ্ণপদ সরকারের হিসাবে একটি জার্সি গাই এবং একটি দেশী গাই মিলিয়ে মূল্য ৪৫,০০০ টাকা, যা সাধারণ গ্রামবাসীর পক্ষে যথেষ্টই। এই বিবেকহীন সরকারী পোষিত বুদ্ধিজীবীরা একমাত্র গরুচোরদের খাদ্যাভ্যাসের কথাই ভাবেন।

গরুচোরদের প্রতি এই সহানুভূতি কেন, তা আমাদের জানা নেই। তবে আমাদের জানা আছে যে গোভক্তি বাঙালির ঐতিহ্যর অংশ যা বোঝা যায় শ্রীহট্টের রাজা গৌরগোবিন্দের উপাখ্যানে (মুসলিম বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য, বাংলা অ্যাকাডেমি, প ২০৫) অথবা  ঠাকুরবাড়ির গোহত্যা বিরোধিতার এই খবর থেকেও । যে রবীন্দ্রনাথ বারম্বার উচ্চারিত হন বুদ্ধিজীবী সমাজের বক্তব্যে, তিনি নিজে নিঃসন্দেহে বিব্রত হতেন তাঁর তথাকথিত ভক্তকুলের আচরণে। দৈনিক প্রথম আলো থেকে দেখা যায়ঃ

শাহজাদপুরের অদূরে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে ঢাকা-বগুড়া সড়কে স্থাপিত সেতু থেকে সোজা পশ্চিমে তাকালে এক কিলোমিটার দূরেই দেখা যায়, বড়াল ও ধরলা নদীর মধ্যবর্তী জায়গার ওই জমি। এখানে ছিল কবির গো-খামার ও গো-চারণভূমি (বাথান)। এই গো-খামারের জন্য রবীন্দ্রনাথ পাঞ্জাবের শাহিওয়াল থেকে উন্নত জাতের ষাঁড় গরু এনে স্থানীয় গাই গরুর সঙ্গে ‘ক্রস’ করে ‘পাবনা ব্রিড’ নামের এক নতুন জাতের গো-প্রজাতি উদ্ভাবন করেছিলেন।

অর্থাৎ, সমাজ সম্পর্কে সচেতনতার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে রবীন্দ্রনাথ রেখেছিলেন গোভক্তিকেও। হয়তো রবীন্দ্রনাথের এই ব্যক্তিজীবনের অংশগুলিই ‘ধুতে হবে এবং মুছতে হবে’ মৌসুমি ভৌমিকদের।

আনন্দবাজারে বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর উপর “হিন্দু সঙ্ঘীয়দের আক্রমণ”এর পুরনো কাসুন্দি ঘাঁটা হয়েছে আরেকবার, বস্তুত যার বেশিভাগ ক্ষেত্রে তদন্ত করে দেখা যায় যে তা সাম্প্রদায়িক আক্রমণ নয়। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য হল নদীয়ার এক চার্চের ঘটনা, যা নিয়ে প্রচুর জলঘোলার পরে দেখা যায় যে প্রধান অভিযুক্ত একজন বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী । এমন কি এই জুনেদের ঘটনাটিও, এই রিপোর্ট অনুযায়ী, ঘটেছিল বসার জায়গা নিয়ে বচসার কারণে। কৃষ্ণাঙ্গদের উপর আক্রমণের ক্ষেত্রেও অজস্র আক্রমণের উপাখ্যানের কথা বলেও উপস্থাপিত করা হয়েছে এই ঘোর দুর্দিনের মুখচ্ছবি, স্বাভাবিক ভাবেই এই ধরণের ঘটনার ক্ষেত্রেও সত্য দেখা গিয়েছে অনেকটা আলাদা

কিছু কিছু ‘সাংবাদিক’ অবশ্য তথ্যের মাধ্যমে তাদের দাবী ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরেও শেষ খড়কুটোর মত আঁকড়ে ধরেছেন আবহের কথা। আবার আবহের কথা ধরেই মনে করতে হয় তাহলে ভারতের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে বরিষ্ঠ কংগ্রেস নেতা এ কে এন্টোনির বক্তব্য, যার প্রতিফলন পাওয়া যেতে থাকছে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে। আবহ কেমনভাবে মানুষের কাছে প্রতিফলিত হবে সেটা একান্তভাবেই তার ব্যক্তিগত ব্যাপার, যা সমাজের চাপে সে প্রকাশ করতে না পারলেও গোপন ব্যালটে সে বাধার সম্মুখীন তাকে হতে হবে না।

তাপ-উত্তাপের প্রভাবে হয়তো প্রধানমন্ত্রীকে বাধ্য করিয়েছেন বক্তব্য রাখতে, তবে জনতার থার্মোমিটার কি আর ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর পারদে চলে সমস্ত সময়?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s